চলতি বোরো মৌসুমের শুরুতেই নানা সংকটের মুখে মংলার প্রান্তিক কৃষকেরা। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ ও মাত্রারিক্ত লবনাক্ততা এ সংকটের অন্যতম কারণ। এ সংকটের বর্তমান ধারা অব্যহত থাকলে আগামী এক দশকে মাটির যে উর্বরতা হারাবে তা অদূর ভবিষ্যতে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। গত ২ মার্চ বিকাল ৩ টায় মংলায় সেচ্ছাসেবী সংগঠন ধরিত্রী পল্লীতথ্য কেন্দ্র আয়োজিত এক ব্যাতিক্রমধর্মী কৃষি ক্যাম্পে বক্তারা একথা বলেন।
কৃষি ক্যাম্পে শতাধিক কৃষক ও ক্ষেতমজুর অংশগ্রহণ করেন। ধরিত্রী পল্লীতথ্য কেন্দ্রের সেবা গ্রহীতা জনাব কৃষ্ণ কুমার সরকারে সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কৃষি ক্যাম্পে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জনাব সত্যব্রত নাগ। বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্লক সুপারভাইজার জনাব নাজমুল হাসান। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ধরিত্রী পল্লীতথ্য কেন্দ্রের সভাপতি জনাব বিভাশ চন্দ্র বিশ্বাস ও দৈনিক যুগান্তর এর মংলা প্রতিনিধি জনাব আমির হোসেন আমু প্রমূখ। অনুষ্ঠানে ধরিত্রীর কার্যক্রম, কৃষি ক্যাম্পের উদ্যেশ্য ও মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরেন পল্লীতথ্য কেন্দ্রের কেন্দ্র ব্যবস্থাপক জনাব তরিকুল ইসলাম।
প্রধান অথিতি জনাব সত্যব্রত নাগ বলেন, উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের পরিকল্পনায় ১৫০ হেক্টর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর এই প্রথম বারের মত মংলায় উচ্চ ফলনশীল জাত, বোরোর আবাদ শুরু হল। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের মাটিতে বোরো ধানের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও আনুসাঙ্গিক কিছু সংকটের কারণে উৎপাদনের ক্ষেত্রে কৃষকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে বোরো আবাদের বাম্পার ফলন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী।
অনুষ্ঠানে আগত কৃষি বিশেজ্ঞরা হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন যে, অবিলম্বে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ বন্ধ করতে হবে; তা না হলে এবং বর্তমান ধারা অব্যহত থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে রকমারী ধানের উৎপাদন শূন্যের কোঠায় পৌঁছাবে এবং সবুজ বেষ্টনী অচিরেই বিরাণ ভূমিতে পরিণত হবে। এ ছাড়া মাটি ও কৃষি যে পরিমাণ ক্ষতি হবে তা আগামী ৫০ বছরেও কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে না।
কৃষি ক্যাম্প সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে স্থানীয় একজন ব্লকসুপারভাইজার বলেন, আমরা উপজেলায় কয়েকজন মাত্র ব্লক সুপারভাইজার। আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না প্রত্যেক কৃষকের কাছে গিয়ে তাদের সমস্যাগুলো শোনা। পল্লীতথ্য কেন্দ্র যে কৃষি ক্যাম্পের আয়োজন করেছে তা সত্যিকারে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। তারা একসাথে মোংলা উপজেলার প্রায় সকল কৃষককে একত্রিত করতে পেরেছে যা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আজ হতে পল্লীতথ্য কেন্দ্র আমাদের কাজ ভাগ করে নিল। এরপর থেকে আমাদের কাজের চাপ কমে যাবে বলে আশা করছি।
তিনি আরো বলেন, এ অঞ্চলে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, মাত্রাতিরিক্ত লবনাক্ততা বোরো আবাদের প্রধান অন্তরায়। কৃষি অফিসের উদ্যোগে জমির মালিক ও প্রান্তিক চাষীরা লবনাক্ততা প্রতিরোধে বছরের শুরুতেই খাল বাধার উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে জনসচেনতা তৈরি ও এলাকার অধিকাংশ খালে বাধ দেওয়ার জন্য আমরা অগ্রণী ভুমিকা পালন করি। অনেক কৃষকই প্রথমবারের মত এ আবাদে এগিয়ে আসেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের শুরুতেই তারা নানা সংকটে পড়েন। মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের ওই সংকট লাঘবের জন্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ধরিত্রী পল্লীতথ্য কেন্দ্রের উদ্যোগ নি:সন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্যাম্পে অংশগ্রহনকারী শতাধিক প্রান্তিক কৃষক বোরো আবাদের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার আহবান জানান। ক্যাম্পে অংশ নেয়া কৃষক ডা: আব্দুল লতিফ, সমর সরকার, আনন্দ মন্ডল, আ: রহমান, সেন চন্দ্র গুপ্ত সহ অনেকেই জানালেন অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ ও লবনাক্ততা প্রতিরোধ না করতে পারলে এ অঞ্চলে ধানের আবাদ হুমকির মুখে পড়বে। এছাড়াও তারা মোংলা উপজেলার নদীতে ভেড়ি বাধ অথবা খালের উপর বাধ সৃষ্টি করার কথা বলেন এবং কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে আবেদন জানায়।
সমাপনী বক্তব্যে ধরিত্রীর সহ-সভাপতি জনাব বিভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলায় বোরো চাষের উপর জোর দিতে হবে এবং সকলেকে এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে।